নিজস্ব প্রতিবেদক । জাতীয় । Qtv Bangla
রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআরটিসি)–এর বাসগুলোর পরিবেশগত মান নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তিনি বলেছেন, বিআরটিসির প্রতিটি বাস থেকেই কালো ধোঁয়া বের হয়, যা ভয়াবহ বায়ুদূষণের জন্য বড় একটি কারণ।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে বিআরটিএ আয়োজিত পেশাজীবী পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও শব্দদূষণ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ পরিবেশ উপদেষ্টার
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন,
“একটা কাজের কথা একটু মন খারাপ করে বলি। বিআরটিসির যত বাস আছে, সবকটা বাস থেকেই কালো ধোঁয়া বের হয়। সবকটা বাস—আমি চ্যালেঞ্জ করে বলে গেলাম। প্রতিটা বাস থেকে কালো ধোঁয়া বের হয়। এইগুলো কি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতাম না?”
পরিবেশ উপদেষ্টার এই বক্তব্য সরকারি পরিবহন ব্যবস্থার পরিবেশগত দুরবস্থাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্ক্র্যাপ পলিসি নিয়ে আক্ষেপ
বিআরটিসির পুরোনো ও দূষণকারী যানবাহন সরাতে দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তাবিত স্ক্র্যাপ পলিসি বাস্তবায়ন না হওয়ায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেন পরিবেশ উপদেষ্টা।
তিনি বলেন,
“আমি প্রায় ১০ মাস ধরে যতবার একটা স্ক্র্যাপ পলিসির জন্য ফোন করেছি, জানি না ফাওজুল ভাই (সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা) কতবার ফোন করেছেন। গত বছরের ২৮ অক্টোবর যেই স্ক্র্যাপ পলিসি ফাইনাল হওয়ার কথা ছিল, সেটা এখনও হয়নি।”
তার মতে, দূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার যদি নিজস্ব সংস্থার বিরুদ্ধেই কঠোর না হয়, তাহলে বেসরকারি পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে শৃঙ্খলা আশা করা কঠিন।
পুরোনো বাস বদলাতে আর কত সময়?
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দূষণকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন,
“আমরা বলছি না আজকেই সব পুরোনো বাস তুলে ফেলেন। কিন্তু অন্তত মেন্টেন্যান্সটা তো করেন। পুরোনো বাস বদলাতে সময় লাগবে—এই যুক্তি কতদিন চলবে? ৫৪ বছর হয়ে গেছে, না? আর কত সময় লাগবে?”
তার এই বক্তব্যে বিআরটিসির দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
বিআরটিএ ও বিআরটিসির সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, শুধু আইন করে বা জরিমানা করেই সমস্যার সমাধান হবে না। এ জন্য বিআরটিএ ও বিআরটিসির মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
তিনি বলেন,
“প্রতিটা বাস মেন্টেন্যান্সে যাবে। সেখানে বিআরটিসির একটা বড় দায়িত্ব আছে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
শব্দদূষণ ও দায়িত্বশীল চালনার ওপর জোর
অনুষ্ঠানে পরিবহন চালকদের উদ্দেশে তিনি শব্দদূষণ কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন,
“আজকে যে প্রশিক্ষণটা শুরু করেছি, বিআরটিএ যেন সব চালকদের জানায়—দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি চালানো কীভাবে করতে হবে। অকারণে হর্ন বাজানো বন্ধ করলে গাড়ির গতি কমবে, দুর্ঘটনাও কমবে।”
তিনি আরও বলেন,
“গাড়িতে উঠে ক্ষমতা দেখানোর জায়গা এটা না। অহেতুক হর্ন বাজালে সাধারণ মানুষের কষ্ট হয়।”
উপস্থিত ছিলেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন—
- সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান
- বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা
- প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী শেখ মইনউদ্দিন
- পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ
- বিআরটিএ চেয়ারম্যান আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ
- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু
- বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম
ঢাকার বায়ুদূষণের বড় উৎস যানবাহন
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হলো পুরোনো ও অকার্যকর ডিজেলচালিত যানবাহন। বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি বাসগুলোর কালো ধোঁয়া সরাসরি বাতাসে পিএম ২.৫ ও পিএম ১০–এর মতো ক্ষতিকর কণার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংস্থা আইকিউএয়ারের প্রতিবেদনে ঢাকার বাতাসকে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ ঘোষণা করা হয়েছে, যেখানে যানবাহনের ধোঁয়াকে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন কালো ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকলে—
- শ্বাসকষ্ট
- হাঁপানি
- হৃদরোগ
- ফুসফুসের ক্যানসার
- শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা
সহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
কঠোর সিদ্ধান্ত ছাড়া সমাধান নেই
পরিবেশবিদদের মতে, পরিবেশ উপদেষ্টার এই বক্তব্য শুধু সমালোচনা নয়, বরং এটি একটি নীতিগত সতর্কবার্তা। স্ক্র্যাপ পলিসি দ্রুত বাস্তবায়ন, সরকারি পরিবহনের আধুনিকায়ন এবং নিয়মিত মেন্টেন্যান্স নিশ্চিত করা না গেলে ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা হিসেবে বিআরটিসি যদি পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে নেতৃত্ব না দেয়, তাহলে বেসরকারি খাত থেকে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা কঠিন হবে।
পরিবেশ উপদেষ্টার এই কঠোর ও সরাসরি বক্তব্য ঢাকার বায়ুদূষণ সংকট নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও নীতিগত চাপ সৃষ্টি করবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


