বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রকৃত মজুতের পরিমাণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। দেশের অনেক অঞ্চলেই অনুসন্ধান কাজ শুরু হয়নি বা সম্পন্ন হয়নি। যেসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন চলছে, সেখানকার মজুতও ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে। ফলে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাড়ছে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আমদানিনির্ভরতা। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাগরতল ও অনাবিষ্কৃত স্থলভাগে নতুন অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা গেলে দেশীয় গ্যাস মজুত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) অনুসন্ধান ও খননকাজে সক্রিয় থাকলেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা—যেমন প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও এলসি সংক্রান্ত জটিলতা। এ কারণে নতুন কূপ খননের গতি কমে গেছে।
বাপেক্সের সর্বশেষ তথ্যমতে, ভোলা জেলায় গ্যাসের উল্লেখযোগ্য মজুত নিশ্চিত হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানে ৯টি কূপ খনন শেষ হয়েছে, আরও কয়েকটি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে শাহবাজপুরে ১২২৫ বিসিএফ, উত্তর ভোলায় ৬২২ বিসিএফ এবং ইলিশায় ২০০ বিসিএফসহ মোট ২০৪৭ বিসিএফ গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১৪৩৩ বিসিএফ উত্তোলনযোগ্য।
পেট্রোবাংলার তত্ত্বাবধানে ৫০টি কূপ খননের একটি জাতীয় প্রকল্প চলছে, যার মধ্যে ১৯টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কূপগুলো ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে আরও ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনাও অনুমোদন পর্যায়ে রয়েছে, যা ২০২৯ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া মনে করেন, “দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই নতুন কূপ খননে গতি বাড়ানো জরুরি।” তিনি জানান, এ পর্যন্ত স্থলভাগে ৪৬-৪৭ হাজার লাইন-কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (2D) এবং প্রায় ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক (3D) সিসমিক জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। এর ভিত্তিতে যে অনুসন্ধান কূপগুলো খনন করা হয়েছে, তাতে সফলতার হার ৩:১—অর্থাৎ প্রতি তিনটি কূপে একটি থেকে গ্যাস পাওয়া গেছে।
ড. ভূঁইয়া বলেন, এতদিন সিলেট অঞ্চলকে দেশের পেট্রোলিয়াম হাব হিসেবে ধরা হলেও বর্তমানে হাতিয়া ট্রাফসংলগ্ন অঞ্চলও নতুন গ্যাসভাণ্ডার হিসেবে প্রতিশ্রুতিশীল হয়ে উঠছে। তিনি অনুসন্ধান ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাঁচটি দিকনির্দেশনা দিয়েছেন—
১️⃣ বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রে গভীর খনন ও অনাবিষ্কৃত স্তর শনাক্তকরণ,
২️⃣ মাঝামাঝি অঞ্চলগুলোতে নতুন অনুসন্ধান বৃদ্ধি,
৩️⃣ হিঞ্জ-জোন (পাবনা-ময়মনসিংহ-সিলেট) অঞ্চলে খনন বাড়ানো,
৪️⃣ চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল ভূগঠন এলাকায় অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করা,
৫️⃣ অফশোর এলাকায় নতুন আন্তর্জাতিক টেন্ডার আহ্বান ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করা।
তার হিসাব অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে ৫০টি কূপ খননে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। কিন্তু সফল হলে অন্তত একটি ক্ষেত্র থেকেই ৫০-৫৫ হাজার কোটি টাকার সমমূল্যের গ্যাস আহরণ সম্ভব। অনুসন্ধান কূপে গ্যাস না মিললেও ভূগর্ভস্থ ডেটা ভবিষ্যৎ অনুসন্ধানে অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকে।
বর্তমানে দেশে অবশিষ্ট গ্যাস মজুত প্রায় ৮ টিসিএফ। চলমান ও পরিকল্পিত অনুসন্ধান থেকে আরও ১২ টিসিএফ যোগ হলে মোট সম্ভাব্য মজুত দাঁড়াবে প্রায় ২০ টিসিএফ। এতে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত দেশীয় উৎস থেকে বছরে অন্তত ১ টিসিএফ গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।


