চট্টগ্রামে বিএনপির মনোনয়ন: ১৬ আসনের মধ্যে ১০টিতে প্রার্থী ঘোষণা, ত্যাগীদের বাদ পড়ায় বিক্ষোভ ও ক্ষোভ
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম | Qtv Bangla HD TV
চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে ১০টিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর মনোনয়ন পাওয়া নেতাদের অনুসারীরা উল্লাস ও উচ্ছ্বাসে মেতে উঠলেও, বাদ পড়া ত্যাগী ও জেল-জুলুমের শিকার নেতাদের অনুসারীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা ও ক্ষোভ।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে লায়ন আসলাম চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে আলী আব্বাসের নাম বাদ পড়ায় তাদের অনুসারীরা বিস্মিত হয়েছেন। কেউ কেউ তা মেনে নিতে না পেরে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন।
সীতাকুণ্ডে আসলাম চৌধুরীর অনুসারীরা মঙ্গলবার রাতেই মহাসড়ক অবরোধ করে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা অভিযোগ করেন, দলে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে মাঠে না থাকা ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। মধ্যরাতে আসলাম চৌধুরীর নির্দেশে বিক্ষোভকারীরা সড়ক থেকে সরে যান। তবে সীতাকুণ্ড উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা ঘোষণা দিয়েছেন—আসলাম চৌধুরীকে মনোনয়ন না দিলে তারা কঠোর আন্দোলন শুরু করবেন, এমনকি গণপদত্যাগেও যেতে পারেন।
এ আসনে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যিনি আসলাম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত। তবে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মতে, সালাহউদ্দিনের জনপ্রিয়তা আসলাম চৌধুরীর সমকক্ষ নয়।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে থাকা আলী আব্বাসের পরিবর্তে সাবেক এমপি সরওয়ার জামাল নিজামকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে আব্বাসের অনুসারীরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। অভিযোগ করা হয়েছে—নিজাম ১৬ বছর দলের দুঃসময়ে মাঠে ছিলেন না এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে দলের হয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখেননি। এমনকি তখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, সরওয়ার জামাল নিজাম একসময় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আখতারুজ্জামান চৌধুরী বাবুর প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট ছিলেন। পরে কর্নেল (অব.) অলি আহমদের হাত ধরে বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
অন্যদিকে আলী আব্বাস দীর্ঘ ৩২ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ছাত্রদল, যুবদল ও শ্রমিক দল হয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক পদে আসীন হয়েছেন। তিনি কখনও পদবিহীন ছিলেন না। তাঁর অনুসারীরা আশা করছেন, হাইকমান্ড বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবে।
তিন নেতার ছেলের মনোনয়ন চমক
চট্টগ্রামে এবার তিনজন বিএনপি নেতার ছেলেরা মনোনয়ন পেয়েছেন।
-
চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে সাবেক মেয়র মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রার্থী হয়েছেন।
-
চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে শহীদ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন।
-
চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাফরুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা প্রার্থী হয়েছেন।
তবে বাঁশখালী আসনে ত্যাগী নেতা লিয়াকত আলী চেয়ারম্যানের মনোনয়ন না পাওয়ায় তার অনুসারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
অবশিষ্ট আসনে অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা
চট্টগ্রামের ছয়টি আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। এসব আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা উদ্বেগে রয়েছেন। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্বে জড়িত দুই নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর আসনেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি), চট্টগ্রাম-১১ (পতেঙ্গা), চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক) এবং চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনেও এখনো প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। ফলে সেসব আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী ও কর্মী-সমর্থকরা দারুণ উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন।
চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বিএনপির এই প্রার্থী তালিকা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। কেউ আনন্দে, কেউ হতাশায়—সবমিলিয়ে মনোনয়ন-পরবর্তী চট্টগ্রাম এখন রাজনীতির উত্তপ্ত কেন্দ্রবিন্দুতে।


