শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:৫৫ অপরাহ্ন
Headline
Wellcome to our website...
বিশ্ববাসী কেন ফিলিস্তিনিদের কান্না দেখতে পায় না?
প্রকাশ কাল | বুধবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৫, ৫:৫২ অপরাহ্ন
ফিলিস্তিন, গাজা যুদ্ধবিরতি, মানবিক সংকট, শার্ম আল শেখ, আন্তর্জাতিক নীতি, গণহত্যা, যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা, মধ্যপ্রাচ্য শান্তি, মানবাধিকার
ছবি: সংগৃহীত

গাজায় যে করুণ চিত্রটি ফুটে উঠেছে — বাড়িঘর ধ্বংস, অনেক মানুষের নামই অজানাভাবে মৃত্যু ও হাজারো অনাহার-দারিদ্র্যের মধ্যেকার ঠিকানা — সেটি কোনোদিন কেবল “সংখ্যার” অভিযোগ নয়। কিন্তু প্রশ্ন জাগে: কেন বিশ্ববাসী, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গণমাধ্যম—যেগুলো সাধারণত মানবিক সংকটের উপর আলোকপাত করে—সরাসরি ও তীক্ষ্ণভাবে গাজার বাচ্চাদের আর্তনাদ, মা–বাবার হাহাকার আর শোকার্ত জনসমাবেশ দেখছেন না বা দেখাতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না?

এই প্রশ্নটি ধারণ ও বাস্তব—উভয় দিকই যোগ্য বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, মিডিয়া ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ভারসাম্য: শার্ম আল-শেখের মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে যখন বড় দেশগুলোর নেতারা কূটনীতি ও সমঝোতার ছবি পছন্দ করেন, তখন ‘ক্ষুদ্র’ অথচ ধারাবাহিকভাবে চলমান মানবিক বিপর্যয় উৎপাতে থাকা নিরীহ মানুষের কণ্ঠস্বর প্রেক্ষাপটেই হারিয়ে যায়। মিডিয়া কভারেজে দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার ‘দৃশ্যমানতা’ বৃদ্ধিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের আগ্রহ কাজ করে—যা প্রগতিশীলতা বা মানবিকতা ভিত্তিক থাকে এমন নীতিকে অজস্র ক্ষেত্রে ছাপিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক পক্ষপাত ও নিরাপত্তা-বাদ: কোনো রাষ্ট্র বা মহাশক্তি যখন ‘আলায়ন’ দেয়—উদাহরণস্বরূপ কোনো দেশের নিরাপত্তা বা কৌশলগত স্বার্থ—তবে সেটি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি বা চাপ প্রয়োগের ইচ্ছাকে স্নায়বিকভাবে দুর্বল করে দেয়। বন্দি মুক্তি বা যুদ্ধবিরতির মতো ইস্যুতে যে মানুষের আবেগ প্রকাশ্যভাবে ফুটে ওঠে (উদাহরণ—কোনো বন্দি পরিবারের আবেগঘন দৃশ্য), তা অন্য কেসে নেই—কারণ প্রেস ও সরকারি সূত্রের আলোকচিত্রিক প্রাধান্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সারতেই পারে। ফলে যাদের জীবন চলে—গাজার নিরীহ জনজীবন—তারা হয়তো পৃথিবীর মনোযোগের “মধ্যমর্যাদায়” উঠতে পারে না।

তৃতীয়ত, কৌশলগত নাটক ও জনমত: যুদ্ধবিরতি, মিডিয়েশন বা চুক্তি ঘোষণার সময় স্বাক্ষর করা চুক্তিপত্র ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠানের ছবি স্থানীয় মানুষের কষ্টের উপর চাপিয়ে ‘পেইস বিল্ডিং’ ও ‘ডিপ্লোমেসি স্যাভয়’কে সামনে আনে। কিন্তু বাস্তবে যদি সেই চুক্তি দ্রুত ভাঙে—বা সহিংসতা চালিয়ে যায়—তবে আন্তর্জাতিক চাপ ও তদন্ত প্রক্রিয়া প্রায়শই সময়সাপেক্ষ এবং রাজনৈতিকভাবে ‘মৃদু’ হয়। ফলে শোকও ব্যক্তিগত স্তরে পড়ে—বন্দিদের বাড়ি ফিরে খুশি হওয়া ছবিতে কাঁদা চোখ যতটুকু দেখায়, গাজার অগণিত শিশুর লাশের পাশে সেই চোখ নেই—এটাই নীরস বাস্তব।

চতুর্থত, সংবেদনশীলতার অনুপযুক্ত বন্টন: আন্তর্জাতিক মিডিয়া ও নেটওয়ার্কে কখনও কখনও একটি ঘটনার মানবিকতা কভারেজে ‘প্রাধান্য’ পায় যখন তা কোনো শক্তিশালী দেশের ক্ষেত্রে ঘটে। অন্যদিকে গরীব, বঞ্চিত বা রাজনৈতিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন’ অঞ্চলের ব্যাপারে সংবাদ প্রতি মূহুর্তে অনুজ্জ্বল থেকে যায়। গাজার প্রতি এই “দৃষ্টি-শূন্যতা” সেই অভ্যন্তরীণ কাঠামোই প্রতিফলিত করে—যেখানে রাজনৈতিক চাপ, নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা এবং অ্যাক্সেস-ইস্যু মিলে সংবাদপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

সবশেষে — নৈতিক প্রশ্ন: বিশ্বব্যাপী শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন স্বার্থসিদ্ধির জন্য নির্দিষ্ট কৌশল গ্রহণ করে—তখন অনুকম্পা ও মানবিক প্রতিক্রিয়া কিভাবে কার্যকর চাপে রূপ নেয়? ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠস্বরকে “মানবচিতব্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে দরকার স্বাধীন, শক্তিশালী আইনি তদন্ত, মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিতকরণ, ও অবরোধের অবসান—এবং সেগুলো অনেক সময় কূটনীতিকভাবে কঠিন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রচেষ্টা।

উপসংহার: গাজার মানুষের কষ্ট ‘দেখতে না পাওয়া’ শুধু একটি সাংবাদিকতামূলক অযত্ন নয়—এটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রাধান্য, কৌশলগত স্বার্থ, মিডিয়ার বাছাই এবং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়হীনতার ফল। যদি বিশ্ববাসী সত্যিকার অর্থে ফিলিস্তিনি মানবিক বিপর্যয়কে গুরুত্ব দেয়, তাহলে কেবল আবেগ নয়—ব্যবস্থাগত পরিবর্তন, অবরোধের অবসান, সকল সীমান্তে মানবিক অ্যাক্সেস এবং অপরাধ-তদন্তে সুদৃঢ় উদ্যোগই প্রয়োজন। না হলে কেবল চোখের পানি নয়—মানবতার মৌলিক দায়বদ্ধতাকে বলা যাবে কীভাবে পূরণ হলো?

এই পাতার আরো খবর
Our Like Page