ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে ঘোষণা দিয়েছিলেন—তিনি খুব দ্রুত ইউক্রেন যুদ্ধ থামিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি করবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—ট্রাম্পের কূটনীতি কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে?
ইতিমধ্যে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল কোম্পানি রসনেফট ও লুকঅয়েলের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। জবাবে রাশিয়া পরীক্ষা করেছে তাদের নতুন পারমাণবিক শক্তিচালিত বুরেভেস্টনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও পোসাইডন আন্ডারওয়াটার ড্রোন। উভয় দেশই ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রয়োজনে পারমাণবিক পরীক্ষা পুনরায় শুরু করা হতে পারে। বছরের শুরুর তুলনায় দুই পরাশক্তির সম্পর্ক এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থায়।
ট্রাম্প ও পুতিনের আলাস্কায় অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠক কোনো অগ্রগতি আনতে পারেনি। দুই নেতা নিয়মিত ফোনে কথা বললেও ফলাফল শূন্য। ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফকে বহুবার মস্কো পাঠানো হয়েছে—প্রতিবারই বলা হয়েছে আলোচনায় “অগ্রগতি” হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সমঝোতা আরও দূরে সরে গেছে। কূটনীতিকদের মতে, উইটকফ রুশ অবস্থান যথাযথভাবে বুঝতে ব্যর্থ হন এবং মার্কিন নীতি স্পষ্ট করতে পারেন না। এতে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে।
আলাস্কার বৈঠকের সময় এই বিভ্রাট আরও স্পষ্ট হয়। বৈঠক হঠাৎ সংক্ষিপ্ত করা হয়, এবং কোনো যুদ্ধবিরতি বা নতুন প্রক্রিয়া ঘোষণা করা হয়নি। পরে জানা যায়, ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু পুতিন তা প্রত্যাখ্যান করে ইউক্রেনের আত্মসমর্পণ এবং দোনবাসসহ দখলকৃত অঞ্চলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দাবি করেন। এতে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হন।
রাশিয়ার শর্ত অত্যন্ত কঠোর—
- ইউক্রেনকে পাঁচটি দখলকৃত অঞ্চলে রাশিয়ার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে
- নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে
- সেনাবাহিনী কমাতে হবে
- রুশ ভাষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা দিতে হবে
- পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে
ওয়াশিংটন ও কিয়েভের কাছে এগুলো মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, যে কোনো আলোচনার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত যুদ্ধবিরতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মূল বাধা তিনটি—ভূখণ্ড, ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রগতি হচ্ছে না। ট্রাম্প শুরুতে ভূখণ্ড বিষয়ে নমনীয় হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পুতিনের দাবি আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তুরস্ক জানায়, রাশিয়া কিছু ফ্রন্টলাইনে আপোষ করতে পারে, কিন্তু দোনবাসের দাবি তারা ছাড়েনি।
ইউরোপীয় কূটনীতিকরা মনে করেন, ট্রাম্প বিষয়টিকে ‘রিয়েল এস্টেটের মতো ভূমি বিনিময়’ হিসেবে দেখছেন, কিন্তু পুতিনের কাছে এটি ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার প্রশ্ন। রাশিয়া চায় ইউক্রেন সামরিকভাবে দুর্বল এবং রাজনৈতিকভাবে রাশিয়া-বিরোধী জোটে অনাগ্রহী হোক। অন্যদিকে ইউক্রেন চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা।
এ অবস্থায় বুদাপেস্টে আরেকটি শীর্ষ বৈঠকের চেষ্টা হলেও তা ব্যর্থ হয়। রুশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ ও মার্কিন সিনেটর মার্কো রুবিও প্রস্তুতির দায়িত্ব পেলেও কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। রাশিয়া আগের দাবিগুলোই পুনরায় পাঠায়—যা যুক্তরাষ্ট্রকে আরও হতাশ করে।
সব মিলিয়ে, ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্পের উদ্যোগ বাস্তবে কোথাও পৌঁছাচ্ছে না। বরং একের পর এক নিষেধাজ্ঞা, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ও পাল্টা পদক্ষেপে উত্তেজনা আরও গভীর হচ্ছে। শান্তির বদলে শক্তির প্রদর্শনই এখন দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করছে।


